আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মুজতবা খামেনিকে দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের ৮৮ সদস্যের ক্লারিক্যাল সংস্থা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ ভোটের মাধ্যমে তাকে এই পদে নির্বাচিত করেছে।
৫৬ বছর বয়সী কট্টরপন্থী এই আলেম নিহত নেতা আলী খামেনির দ্বিতীয় ছেলে। হামলায় তার মা, স্ত্রী এবং এক বোনও নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হামলার সময় মুজতবা খামেনি সেখানে উপস্থিত না থাকায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস ইরানি জনগণকে ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে এবং নতুন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে বলেছে। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মুজতবা খামেনি কখনও কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি বা সরাসরি জনভোটের মুখোমুখি হননি। তবে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাকে তার বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। প্রায় আট বছর ইরানের প্রেসিডেন্ট এবং পরে ৩৬ বছর দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন আলী খামেনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে তার কম্পাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলায় তিনি নিহত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, মুজতবা খামেনির ক্ষমতায় আসা ইরানের ক্ষমতাকাঠামোয় কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। এতে স্বল্পমেয়াদে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা আলোচনায় যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মুজতবা খামেনি কখনও প্রকাশ্যে নেতৃত্বের উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলেননি। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলে তিনি সাধারণত জনসমক্ষে বক্তৃতা বা রাজনৈতিক ভাষণও খুব কম দিয়েছেন। ফলে অনেক ইরানি নাগরিক তার কণ্ঠস্বরও কখনও শোনেননি বলে জানা যায়।
সমালোচকদের অভিযোগ, প্রায় দুই দশক ধরে ইরানে বিক্ষোভ দমনে তার ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’–পরবর্তী আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়নে তার নাম জড়িয়েছে বলে বিরোধীরা দাবি করে। ওই আন্দোলনের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন আন্দোলন দমনে আইআরজিসির বেসিজ বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা হয়েছে।
মুজতবা খামেনি একজন মধ্যম পর্যায়ের ধর্মীয় নেতা বা ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ পদমর্যাদার আলেম। যদিও সাধারণত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জন্য আয়াতুল্লাহ পদমর্যাদা প্রত্যাশিত, তবে ১৯৮৯ সালে আলী খামেনি ক্ষমতায় আসার সময়ও একই ধরনের আইনগত সমন্বয় করা হয়েছিল।
এদিকে পশ্চিমা বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মুজতবা খামেনির সঙ্গে বহু দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ ও বিনিয়োগ নেটওয়ার্কের সম্পর্ক রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র বোমা হামলার মধ্যে ইরানে ইন্টারনেট সীমিত করা হয়েছে এবং তথ্যপ্রবাহে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে নতুন নেতৃত্বের অধীনে দেশটির পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি