আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রায় ১০ দিনের ঐতিহাসিক মহাকাশ ভ্রমণ শেষে চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরেছেন আর্টেমিস II মিশনের চার নভোচারী। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) প্রশান্ত মহাসাগরে সফলভাবে অবতরণ (স্প্ল্যাশডাউন) করে তাদের বহনকারী ক্যাপসুল।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুল, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ইন্টেগ্রিটি’, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের কাছে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৭ মিনিটে সমুদ্রে অবতরণ করে। এর মাধ্যমে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো মানুষ চাঁদের নিকটবর্তী অঞ্চলে ভ্রমণ সম্পন্ন করল।
মিশন চলাকালে নভোচারীরা পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরে পৌঁছান,যা মানুষের মহাকাশ ভ্রমণের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড। তারা মোট প্রায় ৬ লাখ ৯৪ হাজার মাইল পথ অতিক্রম করেন, যার মধ্যে ছিল পৃথিবীর কক্ষপথে দুইবার প্রদক্ষিণ এবং চাঁদের প্রায় ৪ হাজার মাইল দূর দিয়ে উড্ডয়ন।
স্প্ল্যাশডাউনের পর মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান বার্তা দেন, আমরা স্থিতিশীল অবস্থায় আছি চারজনই নিরাপদ। এরপর দ্রুত উদ্ধার অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ক্যাপসুলটি নিরাপদ করে এবং নভোচারীদের উদ্ধার করে।
অন্য তিন নভোচারী হলেন ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। এ মিশনে গ্লোভার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ, কচ প্রথম নারী এবং হ্যানসেন প্রথম অ-মার্কিন নভোচারী হিসেবে চাঁদের মিশনে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়েন।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ ছিল পুরো মিশনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ। ক্যাপসুলটি শব্দের গতির ৩২ গুণ বেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, যেখানে তাপমাত্রা প্রায় ৫,০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছায়। এ সময় তীব্র তাপ ও ঘর্ষণ সহ্য করার ক্ষেত্রে তাপঢাল (হিট শিল্ড)-এর কার্যকারিতা সফলভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
অবতরণের সময় প্যারাস্যুটের মাধ্যমে গতি কমিয়ে ক্যাপসুলটি ঘণ্টায় প্রায় ১৫ মাইল বেগে পানিতে নামে। উদ্ধারকারী ডুবুরিরা ক্যাপসুল স্থিতিশীল করার পর নভোচারীদের হেলিকপ্টারে করে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস জন পি. মুরথাতে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
১ এপ্রিল ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটে চড়ে যাত্রা শুরু করেন তারা। এটি ছিল আর্টেমিস কর্মসূচির প্রথম মানববাহী পরীক্ষা মিশন, যার লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে আবার চাঁদের মাটিতে মানুষ নামানো।
এর আগে সর্বশেষ মানুষ চাঁদের কক্ষপথে গিয়েছিল Apollo 13 মিশনের মাধ্যমে ১৯৭০ সালে। আর চাঁদের মাটিতে সর্বশেষ অবতরণ হয়েছিল Apollo 17 মিশনে, ১৯৭২ সালে।
এই সফল মিশন ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী মানব উপস্থিতি গড়ে তোলা এবং পরবর্তীতে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump নভোচারীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “পুরো ভ্রমণ ছিল অসাধারণ, অবতরণ ছিল নিখুঁত—আমি অত্যন্ত গর্বিত।”
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজেট কাটছাঁট ও জনবল হ্রাসের কারণে নাসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কিছুটা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তারপরও সংস্থাটি চাঁদে ফেরার প্রতিযোগিতায় চীনের আগেই সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
মিশন শেষে এখন Artemis III-এর দিকে নজর দিচ্ছে নাসা, যেখানে নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি