| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বন্ধ ভাঙ্গা কুমার নদের নৌকা বাইচ

reporter
  • আপডেট টাইম: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৫ ইং | ০৬:১০:৩২:পূর্বাহ্ন  |  ১৫৫৩৫৮৩ বার পঠিত
দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বন্ধ ভাঙ্গা কুমার নদের নৌকা বাইচ
ছবির ক্যাপশন: দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বন্ধ ভাঙ্গা কুমার নদের নৌকা বাইচ

মামুনুর রশীদ, ভাঙ্গা (ফরিদপুর) :

ভাদ্র মাসের চৈত্র সংক্রান্ত বা বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার পৌরসদরের কুমার নদের নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ার সমৃদ্ধ ইতিহাস প্রায় দুই শতাধিক বছরের।

অধুনা বিলুপ্তির পথে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও আজও গ্রামবাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের তালিকায় যুগযুগান্তর ধরে আবহমান বাংলার মানুষের অন্যতম বিনোদন হচ্ছে নৌকা বাইচ।

বিনোদন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যর ধারাবাহিকতায় সারাদেশে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দোসরদের নগ্ন চেতনার হস্তক্ষেপে দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর ধরে নৌকা বাইচ বিনোদন থেকে বঞ্চিত ভাঙ্গা উপজেলার প্রায় তিন লক্ষাধীক জনগণসহ পার্শ্ববর্তী জেলা ও উপজেলার সাংস্কৃতিক প্রেমী এবং সাধারণ মানুষ।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কথিত জেএমবির সারাদেশে একযোগে বোমা বিস্ফোরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বার্তা বলে তৎকালীন রাজনৈতিক ধারকগণ ভাঙ্গা উপজেলার কুমার নদের নৌকা বাইচ বন্ধ ঘোষণা করেন। সেই থেকে আজও অবধি কুমার নদের নৌকা বাইচ বন্ধ রয়েছে।

প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্ত তারিখ ও সময় এলে নদীর দুই তীর জুড়ে হরেক রকমের মেলা বসলেও কুমার নদে নৌকা বাইচ পরিবর্তে ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ও স্পিড বোর্ড বাইচ সমতুল্য ভীড় জমিয়ে তোলেন বিনোদন ধারার শত শত  সাংস্কৃতিক প্রেমীরা।

মাঝ নদীতে নৌকা বাইচ এবং দুই তীরে মেলার হরেক রকমের পসরা সাজিয়ে স্থানীয় ও বিভিন্ন জায়গা থেকে মেলা উপলক্ষে আসা ব্যবসায়ীরা খোলা আকাশের নিচে এবং ছাউনি তৈরি করে মিষ্টি মন্ডা, কাঠের সামগ্রী, মাটির সরঞ্জামসহ এবং হোটেল রেষ্টুরেন্টে পরিচালনা করেন।

ভাঙ্গা উপজেলার পাশ্ববর্তী জেলা ও উপজেলার থেকে নদী ও সড়ক পথে লক্ষাধীক জনগণ মেলা ও নৌকা বাইচে ভীড় জমে উঠার মধ্যে দিয়ে কোটি টাকার অধীক বেচাকেনায় একদিনের মেলায় অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হয়ে ওঠেন ব্যবসায়ী মহল।

জানা গেছে, ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট  সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলার পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ ও স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের লোকজন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কার অভিযোগে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপে  কুমার নদের নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা বন্ধের চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে বন্ধ করে দেয় কুমার নদের নৌকা বাইচ।

আওয়ামী লীগের গত ১৭টি বছর শেখ হাসিনার ভাতিজা সাবেক সংসদ সদস্য  মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন কুমার নদের নৌকা বাইচ বন্ধের ঘোষণার বিপক্ষে সহসাই অবস্থান করতে দেখা যায়নি। নৌকা বাইচ কমিটি ও বাজারের ব্যবসায়ী মহল ও প্রবীণ হিন্দু সম্প্রদায়ের স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্যর কাছে নৌকা বাইচ করার ইচ্ছে পোষণ করেও ফলপ্রসূ কিছু না পাওয়ায় চরম সংক্ষুব্ধ ছিলেন তারা। আওয়ামী লীগের দোসরদের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেনি বলে চুপচাপ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হন নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিতব্যর পক্ষের জনগণ।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়ন থেকে মান্নান মাতুব্বর ( বড়দিয়া) ওবায়দুর রহমান ( পশ্চিম আলগী)  বাবুল মিয়া ( বলিয়া) ওয়াদুদ মাষ্টার (আশফরদী), সামাদ ফকির ( মানিকদী) এবং ঘারুয়া ইউনিয়নের মকরম পট্টি গ্রামের জহুরুল আলী, জেলার নগরকান্দা ও মুকসুদপুর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়ার নেতৃত্বে বিশাল বড় বড় বাচারি নৌকায় হরেক রকম রঙিন প্রচ্ছদের পোষাক পরিধান করে মাঝি মাল্লাদের নিয়ে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা করতে কুমার নদে আসতেন তারা। নৌকার সামনে একজন সরদার বাশি বাজিয়ে নৌকার মাঝি মাল্লাদের আরও দ্রুত গতিতে নৌকা চালানোর জন্য উৎসাহ ও উদ্দীপনা যুগিয়ে থাকতেন। বাইচ প্রতিযোগিতায় ভাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী জেলা উপজেলার শতাধীক ছোট বড় ও মাঝারি ধরনের নৌকা মালিকরা অংশগ্রহণ করতো জনগণের জন্য বিশাল বিনোদনের উপকরণ হয়ে দেখা দেয় সকলের কাছে।

নদীর দু'তীরবর্তী  ও বাসা-বাড়িতে নারী ও পুরুষ শিশু কিশোর কিশোরীর এবং বয়স্ক ব্যক্তিরা ভীড় জমানোর পাশাপাশি সেতুর উপর এবং নদীর তীরের গাছে ঝুলে এবং বাড়ির ছাঁদে দাড়িয়ে কুমার নদের নৌকা বাইচ উপভোগ করতেন দূরদূরান্তের জনগণ। বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পথে মেলা থেকে মিষ্টি মন্ডা এবং শিশুদের জন্য মাটির তৈরি খেলনা সামগ্রী কিনে তারা ঘরে ফিরে যেতেন।

নৌকা বাইচে অংশ গ্রহনকারী বিজয়ীদের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয় প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় স্থান অর্জনকারীর পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী সকল নৌকা বাইচের মাঝি মাল্লাদের থানা পুলিশ ষ্টেশন চত্বরে পুরস্কার বিতরণ করতেন ভাঙ্গা বাজার বণিক সমিতি কর্তৃপক্ষ।

সময়ের সাহসী চেতনায় আজ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও ভাঙ্গা উপজেলার কুমার নদের ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ বন্ধ রাখার যৌক্তিক উপসংহার কোথায় কেউ জানে না।

স্থানীয় জনগণ ও সনাতনধর্মের অনুসারীদের দাবী দুই শতাধিক বছরের সমৃদ্ধ স্মৃতি বিজড়িত ইতিহাস ভাঙ্গা কুমার নদের নৌকা বাইচ বন্ধ ঘোষণার অবসান ঘটিয়ে গ্রামীণ জনপদে দৃশ্যমান হয়ে ওঠুক ঐতিহাসিক বাস্তবতার নিরিখের ভাঙ্গা উপজেলার কুমার নদের নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতা এটাই তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সময়ের চাওয়া।

ভাঙ্গা বাজার কমিটির সহসভাপতি মিয়ান আলমগীর হোসেন জানান, গ্রামীণ জনসাধারণের বিনোদনের বিশেষ  একটি উপকরণ হচ্ছে নৌকা বাইচ। দীর্ঘদিন ধরে নৌকা বাইচ বন্ধ ঘোষণায় বিনোদন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নৌকা বাইচ থেকে যেমন আমরা বঞ্চিত তেমনি একদিনের বিশাল মেলা ঘিরে কেনাবেচা করে থাকতেন ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ থেকে হচ্ছেন বঞ্চিত।

আলগী ন্যাশনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহতাবউদ্দিন বলেন, ভাঙ্গা কুমার নদের নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিনোদনের মাধ্যমে হিসেবে বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হত। আলগী ইউনিয়ন থেকে বেশ কয়েকটি বড় বাচারি নৌকা নিয়ে আপনজনেরা অংশ গ্রহন করতেন। দিন দিন সেই গ্রামীন ঐতিহ্য আমরা হারাতে বসেছি। কুমার নদের নৌকা বাইচ বন্ধ নয় আবার ফিরে আসুক বলে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন।

ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিম বলেন, ভাঙ্গা উপজেলার কুমার নদের নৌকা বাইচ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার দোহাই দিয়ে বন্ধ রাখার ঘোষণা করেন। দীর্ঘদিন ধরে ভাঙ্গা ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা উপজেলার জনগণের কাছ থেকে দাবী কুমার নদের ইতিহাস ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত  হোক কিন্তু জনগণের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। নৌকা বাইচ চালুকরণের বিষয়টি মাথায় নিয়ে এগিয়ে চলছি বলে উল্লেখ করে তিনি আশ্বস্ত করেন চলতি বছরের ভাদ্র সংক্রান্ত উপলক্ষে কুমার নদের নৌকা বাইচ সকল জনগণ উপভোগ করতে পারেন সকল চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ভাঙ্গা কুমার নদের নৌকা বাইচ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ঘোষণার বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে জানার পাশাপাশি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি থেকে নৌকা বাইচ চালুকরণ বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জনগণের বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে জানান।




এস

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪