| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

আল-মাজদ ইউরোপ নেটওয়ার্কের অন্ধকার বাস্তবতা

গাজা থেকে রহস্যময় পথে পলায়ন

reporter
  • আপডেট টাইম: নভেম্বর ১৬, ২০২৫ ইং | ১৭:১৪:০০:অপরাহ্ন  |  ১২৭৬৬৭৬ বার পঠিত
গাজা থেকে রহস্যময় পথে পলায়ন
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত

আশিস গুপ্ত : গাজার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে পালানোর মরিয়া আকাঙ্ক্ষা যে কীভাবে এক অন্ধকার গোপন নেটওয়ার্ককে বৈধ সুযোগে পরিণত করেছে, তার এক তীব্র ও আতঙ্কজনক চিত্র উঠে আসে সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকায় নথিবিহীন অবস্থায় পৌঁছানো ফিলিস্তিনিদের অভিজ্ঞতা থেকে। 

যুদ্ধক্ষতবিদ্ধ এই অঞ্চল থেকে বাঁচার পথ খুঁজতে থাকা মানুষদের জন্য আল-মাজদ ইউরোপ নামের এক রহস্যময় সংগঠন যেন হয়ে উঠেছে শেষ আশ্রয়—যদিও এর পুরো কাঠামো ভর করে আছে অনিশ্চয়তা, আর্থিক শোষণ এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সক্রিয় সমন্বয়ের ওপর।

ফিলিস্তিনি একজন পুরুষ, যিনি নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলছেন যে গাজা ছাড়ার প্রক্রিয়াটি তাকে অবাক করেছে তার স্বাভাবিকতা দিয়ে—যেন একটি রাষ্ট্রীয় অনুমোদিত ভ্রমণ পরিকল্পনা। 

তার বর্ণনায় উঠে আসে কিভাবে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তল্লাশি করে তাকে এবং অন্যদের ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত কেরেম আবু সালেম চেকপয়েন্ট পেরিয়ে বাসে করে দক্ষিণ ইসরায়েলে এবং সেখান থেকে রামন বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানবন্দরে ইসরায়েল তাদের পাসপোর্টে সিল দেয়নি, কারণ তারা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় না। তারপর একটি রোমানিয়ান বিমানে করে প্রথমে তাদের পাঠানো হয় কেনিয়ায়—যা তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল না, শুধু একটি ট্রানজিট।

তিনি জানান, আল-মাজদ ইউরোপ এবং কেনিয়ার কিছু অংশের প্রশাসনের মধ্যেও সমন্বয় রয়েছে বলে মনে হয়েছে। যাত্রীরা জানতেন না তারা কোন দেশে পৌঁছাবেন, সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো নেটওয়ার্কের ভেতরের কয়েকজন সমন্বয়কারীর দ্বারা—গাজার ভেতরে অন্তত তিনজন এবং বাইরে ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী কয়েকজন ফিলিস্তিনি। অনলাইনে নিবন্ধন ও বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তাকে তিন সদস্যের পরিবারের জন্য ৬,০০০ ডলার দিতে হয়েছে, যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাউন্টে নয়, ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাপের মাধ্যমে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হয়েছে।

তিনি জানান, প্রথম একটি দল জুন মাসে ইন্দোনেশিয়া পৌঁছেছিল, আর দ্বিতীয় দলটি আটকে থাকার পর আগস্টে গাজা ছাড়ার অনুমতি পায়। সর্বশেষ যে ফ্লাইট দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেছে, তাতে প্রত্যেকে ১,৫০০ থেকে ৫,০০০ ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করেছেন এবং সঙ্গে নিতে পেরেছেন শুধু একটি ফোন, অল্প কিছু অর্থ আর একটি ব্যাকপ্যাক।

কিন্তু এই নেটওয়ার্কটির পরিচয় ঘন কুয়াশায় ঢাকা। আল-মাজদ ইউরোপ দাবি করে তারা ২০১০ সালে জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত, অথচ তাদের ওয়েবসাইট তৈরি হয়েছে মাত্র এ বছর। সাইটে ব্যবহৃত নির্বাহীদের ছবি স্পষ্টতই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি, কোনো যাচাইযোগ্য যোগাযোগ নেই, আর ঠিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছে দখলক পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাহ এলাকা—যার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ গভীর।

ওমর নামে আরেক ফিলিস্তিনি জানান যে তাকে জানানো হয়েছিল পাসপোর্ট, জন্মসনদ এবং প্রথম ধাপে ২,৫০০ ডলার জমা দিতে হবে। কিন্তু পরে তাকে বলা হয়, একক ভ্রমণকারীদের আবেদন গ্রহণ করা হয় না, ফলে তার আবেদন বাতিল করা হয়।

গাজার আজ-জাওয়াইদা থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খৌদারি জানাচ্ছেন, ক্রমাগত বোমাবর্ষণ, শিক্ষাব্যবস্থার পতন, ঘরবাড়ি হারানো এবং ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তা মানুষকে এসব অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। শিশুদের জন্য কোনো সম্ভাবনা নেই মনে করে অনেক পরিবার মরিয়া হয়ে এই ছায়াবৃত নেটওয়ার্কের দিকে ঝুঁকছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী স্বীকার করেছে তারা ফিলিস্তিনিদের গাজা ছাড়তে “সহায়তা” করছে, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত “স্বেচ্ছায় প্রস্থান” নীতির অংশ। এই নীতি কার্যকর করতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মার্চ মাসে একটি বিশেষ ইউনিটও গঠন করেছে, নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে।

তবু প্রশ্ন রয়ে যায়—গাজা ছাড়ার এই পথ আদৌ নিরাপদ বা বৈধ কি না? কারা পরিচালনা করছে আল-মাজদ ইউরোপকে? কেন এতো বিপুল অর্থ চাওয়া হচ্ছে? এবং কেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী একটি অশুভ, অদৃশ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় করছে? গাজার মানুষের জীবনের ভয়াবহ সংকট এই প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলছে, আর একই সঙ্গে তুলে ধরছে যুদ্ধের নৃশংস বাস্তবতা—যেখানে বাঁচার মরিয়া চেষ্টা নিজেই হয়ে উঠেছে এক নতুন ঝুঁকি এবং মানবিক বিপর্যয়ের আরেকটি স্তর।

রিপোর্টার্স২৪/এসসি

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪