রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতা আবারও উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। নির্বাচন কমিশন গত ডিসেম্বর মাসে তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন। এতে দেশজুড়ে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রচার কার্যক্রম যে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিএনপি কর্মী আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের পর। গত ৭ জানুয়ারি গুলিতে নিহত হন তিনি। বিষয়টি বিএনপির আরেক কর্মী কাজী শাওন আলমকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
শাওন বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময় চারবার মুসাব্বিরের সঙ্গে তিনি কারাবরণ করেন। সেই সময় বিরোধী দল দমনে ব্যাপক গ্রেপ্তার, গুম ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ছিল সরকারের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অনেকেই ভেবেছিলেন, সেই ভয়াবহ অধ্যায় শেষ হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আবারও সেই আশঙ্কাই উসকে দিচ্ছে।
বর্তমানে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন পরিচালনা করছে। যদিও এই সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দমন-পীড়নের অভিযোগ নেই, তবু নির্বাচনের আগে সহিংসতা বাড়ছে।
ঢাকার এক বিএনপি ছাত্রনেতা শাওন বলেন, পুলিশ বলছে মুসাব্বির হত্যার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু ভয় তো আর সহজে চলে যায় না। আমরা সহিংসতা চাই না, কিন্তু নির্বাচনের সময় সহিংসতা যেন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১২ কোটি ভোটার এবার ভোট দেবেন। এটি শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে এক ধরনের গণরায়ের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে নির্বাচনী সহিংসতার পুরোনো ইতিহাস নতুন করে ফিরে আসার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ বারবার ভোটের সময় রক্তক্ষয়ী সংঘাত দেখেছে।
বর্তমানে ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। ছাত্রদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিও জামায়াত জোটে রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে নির্বাচন করছে। শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে নেই; অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।তবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে সব রাজনৈতিক শিবিরই।
ঢাকার কেরানীগঞ্জে বিএনপি নেতা হাসান মোল্লা (৪২) গত ২৩ জানুয়ারি নিজের নির্বাচনী কার্যালয়ে বসে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনিই তফসিল ঘোষণার পর নিহত ১৬তম রাজনৈতিক কর্মী।
এর আগে জামায়াত নেতা আনোয়ারুল্লাহ (৬৫) ঢাকার রাজাবাজারে নিজ বাসায় নিহত হন। পুলিশ এটিকে ডাকাতির ঘটনা বললেও সন্দেহ কাটেনি। ডিসেম্বরে নিহত হন ছাত্র আন্দোলনের নেতা শরীফ ওসমান হাদি, যিনি সংসদ নির্বাচন করতে যাচ্ছিলেন। তাঁর মৃত্যু ঘিরে দেশজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
এই হত্যাকাণ্ডগুলোর কোনোটিকেই সরকারিভাবে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলা হয়নি। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে সেই ব্যাখ্যা আশ্বস্ত করার মতো নয়।
স্থানীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনই বিএনপির নেতা-কর্মী। বাকি তিনজন জামায়াত, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের যুব সংগঠন ও ছাত্র আন্দোলনের নেতা।
গুলিতে নিহত হয়েছেন অন্তত সাতজন। এতে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় লুট হওয়া ৩,৬১৯ অস্ত্রের মধ্যে প্রায় ১,৩৬০টি এখনো উদ্ধার হয়নি।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর থেকে সারা দেশে অন্তত ৬২টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অতীত নির্বাচনী সহিংসতার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় ৪৯ জন, ২০০৮ সালে ২১ জন এবং ২০১৪ সালে (বিএনপি-জামায়াত বর্জিত নির্বাচন) ১৪২ জন নিহত হয়েছিলেন।
২০১৮ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনগুলো একতরফা হলেও সহিংসতা থামেনি। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী মাত্র চার দিনে আটজন নিহত ও ৫৬০ জন আহত হন।
এবারও সহিংসতার ঝুঁকি শুধু দলগুলোর মধ্যে নয়, দলগুলোর ভেতরেও। টাঙ্গাইলে বিএনপির ছাত্রনেতা তুষার খান অভিযোগ করেছেন, দলেরই এক সিনিয়র নেতার কাছ থেকে তিনি প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতিও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ৭৯টি আসনে বিএনপির ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন।
ঢাকার মিরপুরে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন আহত হন। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মিরপুরের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমাদের মতো সাধারণ ভোটারদের জন্য পরিস্থিতি ভীতিকর। আমরা শুধু শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে চাই।”
পুলিশ বলছে, নির্বাচনী পরিবেশ অনেক বছর পর উৎসবমুখর হলেও নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠেছে। সীমান্তবর্তী কুড়িগ্রামে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মুখোমুখি অবস্থান থেকে সংঘর্ষ এড়াতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ নিরাপত্তা সদস্য, যার মধ্যে এক লাখের বেশি সেনাসদস্য, মোতায়েন থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন কূটনীতিকদের জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সতর্ক করে বলেন, আসল চ্যালেঞ্জ হলো এই ঐতিহাসিক ভয় কাটিয়ে উঠতে সরকারি আশ্বাস যথেষ্ট হবে কি না।
রিপোর্টার্স২৪/এসসি