রিয়াজুল হক:
বাংলাদেশের অর্থনীতির রপ্তানি কাঠামো একদিকে যেমন সাফল্যের গল্প, অন্যদিকে তেমনি ঝুঁকিরও নাম। স্বাধীনতার পর মাত্র কয়েক কোটি ডলারের রপ্তানি আয় থেকে আজ বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই অগ্রযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত। কিন্তু একই সঙ্গে এটিই বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে, অতিরিক্ত নির্ভরতা।
বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪-৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অর্থাৎ একটি খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে পুরো রপ্তানি অর্থনীতি। বৈশ্বিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, ক্রেতা দেশের নীতিগত পরিবর্তন কিংবা প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মতো যেকোনো ধাক্কা পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এই বাস্তবতায় বারবার আলোচনায় আসে একটি প্রশ্ন, 'তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণ কতদূর এগিয়েছে?'
রপ্তানি বহুমুখীকরণকে অনেক সময় নীতিগত লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। বিশ্ববাজারে পোশাকের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইথিওপিয়া, এমনকি আফ্রিকার কয়েকটি দেশ কম খরচে ও উন্নত প্রযুক্তিতে পোশাক উৎপাদনে এগিয়ে আসছে। অন্যদিকে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে পরিবেশ, শ্রম মান, কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি বিষয়ে চাপ বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু পোশাকের ওপর নির্ভর করে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন।
এই প্রেক্ষাপটে কৃষিভিত্তিক পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, আইসিটি ও সেবা রপ্তানি এসব খাতকে সামনে আনার কথা বহু বছর ধরে বলা হচ্ছে। কিন্তু সবকিছুই কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে তেমন কোন অগ্রগতি নেই। অথচ এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। আম, কাঁঠাল, লিচু, আলু, সবজি, মাছ এসব পণ্যের উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি সবজি ও মাছের চাহিদা বাড়ছে। তবে বড় সমস্যা হলো মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও লজিস্টিকস। আন্তর্জাতিক বাজারে ঢুকতে হলে ফাইটোস্যানিটারি মান, প্যাকেজিং, কোল্ড চেইন ও ট্রেসেবিলিটির মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে। ফলে সম্ভাবনা থাকলেও কৃষিভিত্তিক রপ্তানি এখনও বড় আকার নিতে পারছে না।
এক সময় বলা হতো, তৈরি পোশাকের পর চামড়া শিল্পই হবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। কাঁচা চামড়ার উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। কিন্তু বাস্তবে চামড়া খাত আজ সংকটে। সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর অব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত শর্ত পূরণে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন না পাওয়া ইত্যাদি কারণে চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। অনেক বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতা পরিবেশগত কারণে বাংলাদেশ থেকে পণ্য নিতে আগ্রহী নয়। নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের এই ফাঁক চামড়া খাতকে পিছিয়ে দিয়েছে।
তৈরি পোশাকের বাইরে যে কয়েকটি খাত সত্যিকার অর্থে আশার আলো দেখাচ্ছে, তার একটি হচ্ছে ওষুধ শিল্প। বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে ১৫০টির বেশি দেশে। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি ওষুধ ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। তবে এখানেও সীমাবদ্ধতা আছে। উন্নত দেশের বাজারে প্রবেশের জন্য যে মান ও গবেষণা বিনিয়োগ দরকার, তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ওষুধ খাত হতে পারে ভবিষ্যতের বড় রপ্তানি স্তম্ভ।
হালকা প্রকৌশল খাতকে অনেকেই ‘মিসিং লিংক’ বলেন। কৃষিযন্ত্রাংশ, বাইসাইকেল পার্টস, অটো যন্ত্রাংশ ইত্যাদি পণ্যে বাংলাদেশের দক্ষতা রয়েছে। কিন্তু খাতটি এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিকতার বেড়াজালে আটকে রয়েছে।
আইসিটি ও সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ও আইটি সার্ভিস রপ্তানি বাড়ছে। তবে এটিকে বড় রপ্তানি খাতে রূপ দিতে হলে শিক্ষা, দক্ষতা ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ে আরও বিনিয়োগ দরকার।
প্রশ্ন হচ্ছে, এত আলোচনা, এত নীতিপত্রের পরও কেন রপ্তানি বহুমুখীকরণ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না?
প্রথমত, নীতিগত সমন্বয়ের অভাব। শিল্পনীতি, রপ্তানি নীতি, করনীতি ও ব্যাংকিং নীতির মধ্যে সমন্বয় নেই।
দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো ও লজিস্টিকস দুর্বলতা। বন্দর জট, পরিবহন ব্যয় ও সময় এসব রপ্তানির প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয়।
তৃতীয়ত, উদ্যোক্তা সহায়তার সীমাবদ্ধতা। নতুন খাতে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, গবেষণা ও বাজার সংযোগ বেশ দুর্বল। আবার উদ্যোক্তরাও সহায়তাসমূহ সঠিকভাবে ব্যবহারে দক্ষ নয়।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) সুবিধা হারাবে। শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা কমবে। এই বাস্তবতায় পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের রপ্তানি না বাড়াতে পারলে চাপ আরও বাড়বে। বহুমুখীকরণ তখন আর বিকল্প থাকবে না। এজন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতেই হবে। যেমন, নির্দিষ্ট সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। গবেষণা ও উন্নয়নে ভূমিকা বাড়াতে হবে। মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন সহজ করতে হবে। লজিস্টিকস ও বন্দর ব্যবস্থার সংস্কার করা প্রয়োজন।
তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের গর্ব, সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি গাছের ছায়ায় পুরো বন টেকসই হয় না। অর্থনীতিকে নিরাপদ ও টেকসই করতে হলে রপ্তানি বহুমুখীকরণে আর দেরি করার সুযোগ নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
লেখকঃ রিয়াজুল হক, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।