| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

শিক্ষাগুরুর বিভীষিকাকাল

ইউনূস আমলে ৩ মাসে ৩ হাজার শিক্ষক মবের শিকার

২১০০ শিক্ষকের বেতন চালু হলেও বেতনহীন ৭০০ শিক্ষক স্কুলে ফিরতে পারেননি বিএনপি আসার পর স্কুলে ফিরেছেন ২০০ শিক্ষক

reporter
  • আপডেট টাইম: এপ্রিল ২১, ২০২৬ ইং | ০৯:১৯:৪০:পূর্বাহ্ন  |  ২৩১১ বার পঠিত
ইউনূস আমলে ৩ মাসে ৩ হাজার শিক্ষক মবের শিকার

স্টাফ রিপোর্টার: ‘ও ভাই...আমরা শিক্ষক মানুষ, আমরা রাজনীতি করি না। আমরা ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে ছিলাম। ভাই, আমাদের মাইরেন না ভাই। আমাদের ওপর হামলা কইরেন না ভাই! ও ভাই...আমাদের বাঁচান, আমাদের বাঁচান...।’

এভাবেই বদ্ধ ঘরের ভেতরে প্রাণভিক্ষা চেয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করছিলেন কয়েকজন মানুষ। কেউ এ-ঘর থেকে ও-ঘরে ছোটাছুটি করে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন, কেউ মোবাইল ফোনে কাউকে ফোন করার চেষ্টায়। বাইরে থেকে দরজায় সজোরে একের পর এক আঘাত। ধারালো অস্ত্রের কোপে ফেটে যাচ্ছে দরজার কাঠ...।

৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি ভাইরাল ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে এই ভয়াবহ চিত্র। ঘটনাটি ২০২৪ সালের ১৮ আগস্টের। সেদিন বরিশালের গৌরনদীতে ‘মাহিলাড়া এএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর স্টাফ কোয়ার্টারে প্রধান শিক্ষকের বাসায় এ হামলা করা হয়। প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীকে সপরিবারে ঘরের ভেতরে আটকে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে শতাধিক ব্যক্তি।

প্রণয় কান্তির মেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদৃতা অধিকারী ফেসবুক লাইভে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখানো শুরু করলে এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী গিয়ে উদ্ধার করে আক্রান্ত পরিবারটিকে। সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচলেও পরে জোর করে পদত্যাগ করানো হয় প্রধান শিক্ষক প্রণয় অধিকারীকে। এরপর তিনি বরণ করেন নির্বাসিত জীবন। শুরু হয় বঞ্চনা আর মানবেতর জীবনযাপন। সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি মনে করতেও ভয় পান এই শিক্ষক।

গত ১৯ এপ্রিল দুপুরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে অজ্ঞাত স্থান থেকে প্রণয় অধিকারী বলেন, ‘আমার প্রাণের ক্যাম্পাসের ভেতরে আমাকে সপরিবারে এভাবে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে, এ কথা যতবার ভাবি, আমার গা শিউরে ওঠে।’

আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ শুনিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে দেন প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষক, এমন অভিযোগ প্রণয় কান্তির। তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে কোনো দিন রাজনীতি করিনি। এখন মনে হয়, আমার দোষ একটাই—আমি কড়া প্রশাসক, কখনো কোনো অনিয়ম প্রশ্রয় দিইনি। অথচ আমাকে অপরাধী বানিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করে এমন জঘন্য কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়।’

এই শিক্ষক জানান, অনেক দৌড়ঝাঁপের পর গত বছরের ডিসেম্বরে তাঁর বেতন-ভাতা চালু হয়েছে। কিন্তু প্রাণের ভয়ে এখনো স্কুলে ফিরতে পারেননি।

ওই বিভীষিকাময় দিনের ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘বাড়িটির সব দরজা প্রায় ভেঙে ফেলা হয়েছিল। শেষ পর্যায়ে ফেসবুকে লাইভ শুরু হলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলায়। না হলে কী যে হতো, তা ভাবতেও ভয় লাগে।’

একই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক শহিদুল্লাহ বলেন, ‘একজন শিক্ষক সমাজ গঠনের কারিগর, অথচ তিনি আজ নিজেই অন্ধকারে। তাঁর পরিবার আজও বহন করে চলেছে এক ভয়াবহ দিনের দাগ, যা কোনো দিনই মুছে যাওয়ার না।’

প্রণয় কান্তি অধিকারীর মতোই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন দেশের বেসরকারি বিদ্যালয়ের অন্তত তিন হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা। আরো কয়েকজন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও মব-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দেশজুড়ে শুরু হয় ‘মবোৎসব’। এর থেকে রেহাই পাননি মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষাগুরুরাও। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে, স্বৈরাচারের দোসর তকমা দিয়ে নিরপরাধ শিক্ষকদের অপমান-অপদস্থ’, শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন চালানো হয়েছে। জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করিয়ে নেওয়া হয়েছে, তারপর লাঞ্ছিত করে তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বেতন-ভাতাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের পরিবারের ওপরও চালানো হয়েছে নিপীড়ন। ২০২৪ সালের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর—এই তিন মাসেই ঘটে গেছে মব-সন্ত্রাসের এসব নজিরবিহীন ঘটনা। এর পরও অবশ্য আরো কয়েকটি মবের ঘটনা ঘটেছে।

ঠিক কতজন শিক্ষক মবের শিকার হয়েছেন—সুনির্দিষ্টভাবে সে সংখ্যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর বা জেলা শিক্ষা অফিসের কাছে—কোথাও পাওয়া যায়নি। মবের শিকার হওয়া শিক্ষকদের সংগঠন ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর তথ্য মতে, ৫ আগস্টের পর মব-সন্ত্রাসের শিক্ষার হয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় এবং শিক্ষক ও তাঁদের পরিবারের  সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ওই সময় সারা দেশে মবের শিকার হওয়া শিক্ষকের সংখ্যা হবে কমপক্ষে তিন হাজার। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর মধ্যে দুই হাজার ১০০ শিক্ষকের বেতন চালু হলেও এখনো অনেকেই স্কুলে যেতে পারছেন না। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে স্কুলে ফিরেছেন প্রায় ২০০ শিক্ষক, তাঁদের বেতনও চালু হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৭০০ শিক্ষকের বেতন বন্ধ, সব ধরনের দপ্তরে ঘুরেও যোগদান করতে পারছেন না তাঁরা। তাঁদের অনেককে স্কুলে যেতে বাধাও দেওয়া হচ্ছে।

গণমাধ্যমের অনুসন্ধানকালে দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ১২৩ জন শিক্ষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে; যাঁদের মবের মাধ্যমে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ জন শিক্ষকের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। সংগ্রহ করা হয়েছে মবের একাধিক ভিডিও। তাতে দেখা যাচ্ছে, পদত্যাগপত্র মবকারীরা লিখে দিয়েছে; পরে জোর করে, এমনকি শিক্ষকের হাত চেপে ধরে, হুমকি-ধমকি দিয়ে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করা হয়েছে। স্বাক্ষর দিতে না চাইলে প্রাণনাশেরও হুমকি দিতে শোনা গেছে।

শিক্ষকদের ওপর নির্বিচারে হামলার ঘটনায় একবার মুখ খুলেছিলেন তখনকার শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘চর দখলের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছেন।’

কিন্তু ওই বলা পর্যন্তই; নেওয়া হয়নি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ; বরং দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষকদের ওপর মব রুখে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়ে সভা-সমাবেশ করেছিল শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠন।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪