তাওহীদাহ্ রহমান নূভ:
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ইন্টারনেটের অবাধ স্বাধীনতা যেমন আমাদের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, ঠিক তেমনি এর অন্ধকার দিকগুলো তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে এক ভয়ানক গতিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ও নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে অনলাইন জুয়া বা বেটিং। এটি কেবল তরুণদের পকেট খালি করছে না, বরং একটি পুরো প্রজন্মের মানসিকতা, নৈতিকতা এবং ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে।
১. তরুণ সমাজ ধ্বংসের নেপথ্যে অনলাইন জুয়া: কত সূক্ষ্ম এর জাল?
অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনোগুলো অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগতভাবে সুক্ষ্ম উপায়ে ডিজাইন করা, যা একজন তরুণ সহজেই বুঝতে পারে না। এর ফাঁদগুলো মূলত যেভাবে কাজ করে:
সহজে আয়ের লোভ ও ‘গেমিফিকেশন’: জুয়ার অ্যাপ বা সাইটগুলোকে সাধারণ গেমের মতো আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হয়। শুরুতে সামান্য কিছু টাকা জিতিয়ে তরুণের মনে ‘আমিও পারি’ বা ‘সহজেই বড়লোক হওয়া সম্ভব’—এমন একটি বিভ্রম তৈরি করা হয়।
অ্যালগরিদমের মনস্তাত্ত্বিক খেলা: এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কে ডোপামিন (Dopamine) হরমোনের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে একবার হারলে সেই টাকা উসুল করার জন্য এবং জিতলে আরও জেতার নেশায় তরুণরা বারবার ফিরে আসে। এটি একপ্রকার তীব্র মানসিক আসক্তিতে পরিণত হয়।
বিজ্ঞাপনের চাতুর্য ও ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর, এমনকি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বা ফুটবল ম্যাচের সময় নামী তারকাদের দিয়ে প্রচ্ছন্নভাবে এসব অ্যাপের প্রচারণা চালানো হয়। তরুণরা তাদের প্রিয় তারকাদের দেখে বিভ্রান্ত হয়ে এতে প্রলুব্ধ হয়।
আর্থিক ও সামাজিক অবক্ষয়: জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বাদ দিচ্ছে, পরিবারের জমানো টাকা চুরি করছে, এমনকি জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিতে।
২. বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া বন্ধে রাষ্ট্রের করণীয় ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
এই মহামারি থেকে তরুণদের বাঁচাতে রাষ্ট্রের একক এবং কঠোর ভূমিকা নেওয়ার এখনই সময়। রাষ্ট্রকে মূলত তিনটি স্তরে কাজ করতে হবে: প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ, আইনি সংস্কার এবং সচেতনতা।
ক) প্রযুক্তিগত কঠোরতা (Technical Blocking)
গেটওয়ে ব্লক করা: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC)-এর মাধ্যমে দেশের ভেতরে সমস্ত জুয়া এবং বেটিং সাইট ও অ্যাপের ডোমেইন স্থায়ীভাবে ব্লক করতে হবে।
ভিপিএন (VPN) নিয়ন্ত্রণ: সাধারণ ব্লকিং এড়াতে তরুণরা ভিপিএন ব্যবহার করে। তাই প্লে-স্টোর বা অ্যাপ-স্টোর থেকে অননুমোদিত এবং ক্ষতিকর ভিপিএন ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।
খ) আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ
অনলাইন জুয়ার মূল জ্বালানি হলো মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ) এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন ট্র্যাক করতে হবে। জুয়ার সাইটে টাকা রিচার্জের সাথে জড়িত এজেন্ট বা ‘মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট’গুলো চিহ্নিত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
গ) আইনি সংস্কার ও শাস্তির আধুনিকায়ন
আমাদের প্রচলিত ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ অত্যন্ত পুরনো, যেখানে অনলাইন জুয়ার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা বা কঠোর শাস্তির বিধান নেই। এই আইন সংশোধন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের আওতাভুক্ত করতে হবে এবং অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী ও প্রচারকারীদের জন্য অর্থদণ্ডসহ দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের বিধান করতে হবে।
৩. অন্ধকারের বিপরীতে আলো: শিক্ষামূলক কনটেন্ট ক্রিয়েশনের শক্তি
অনলাইন জুয়ার মতো নেতিবাচক আসক্তি থেকে তরুণদের দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের মনোযোগকে একটি সৃজনশীল ও অর্থপূর্ণ বিকল্পের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। এই ক্ষেত্রে শিক্ষামূলক ও গঠনমূলক কনটেন্ট ক্রিয়েশন হতে পারে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
আজকের তরুণরা স্ক্রিন বা পর্দায় সময় কাটাতে পছন্দ করে। আমরা যদি ইন্টারনেটে ক্ষতিকর কনটেন্টের চেয়ে মানসম্মত, আকর্ষণীয় এবং শিক্ষামূলক কনটেন্টের সংখ্যা বাড়াতে পারি, তবে তরুণরা নিজে থেকেই ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ হবে।
কীভাবে শিক্ষামূলক কনটেন্ট তরুণদের ও দেশের উন্নতি ঘটাবে?
দক্ষতা উন্নয়ন (Skill Development): কোডিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, কিংবা ভাষা শিক্ষার মতো ফ্রিল্যান্সিং উপযোগী কনটেন্ট তৈরি করে তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
বিকল্প আয়ের উৎস: জুয়ায় টাকা হারানোর বদলে তরুণরা যখন নিজে কনটেন্ট তৈরি করবে বা কনটেন্ট দেখে স্কিল শিখবে, তখন তারা বৈধভাবে ঘরে বসেই অর্থ উপার্জন (Monetization/Freelancing) করতে পারবে। এতে বেকারত্ব দূর হবে এবং দেশে রেমিট্যান্স আসবে।
মানসিক বিকাশ ও সুস্থ বিনোদন: বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, ভূরাজনীতি বা মহাকাশ নিয়ে তৈরি চমৎকার সব ভিডিও তরুণদের চিন্তার পরিধি বাড়িয়ে দেয়। এটি তাদের কৌতূহলকে ইতিবাচক দিকে ধাবিত করে।
৪. জুয়া ছেড়ে গঠনমূলক কাজে: নিজেকে ও দেশকে গড়ার রোডম্যাপ
যাঁরা বর্তমানে ইন্টারনেটে লক্ষ্যহীনভাবে সময় কাটাচ্ছেন বা জুয়ার ফাঁদে পা দেওয়ার ঝুঁকিতে আছেন, তাঁরা নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে পারেন। অন্ধকার গলি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রথম পদক্ষেপ হলো নিজের মনোযোগকে ঘুরিয়ে দেওয়া। স্ক্রিনের পেছনের সময়টাকে অপচয় না করে, সেটিকে রূপান্তর করতে হবে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় পুঁজিতে।
কনটেন্ট উপভোগকারী থেকে কনটেন্ট নির্মাতা হওয়া: আপনি যে বিষয়ে পারদর্শী—তা হতে পারে গণিত, চমৎকার বাংলায় লেখালেখি, ফটোগ্রাফি, কিংবা কোনো বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ—সেটি নিয়ে ছোট ছোট ভিডিও বা আর্টিকেল তৈরি শুরু করুন। ফেসবুক, ইউটিউব বা লিংকডইনে তা প্রকাশ করুন।
নলেজ শেয়ারিং ও দেশাত্মবোধ: দেশকে ভালোবাসার সেরা উপায় হলো দেশের মানুষকে সচেতন করা। তরুণরা যদি অনলাইন জুয়ার কুফল, সাইবার নিরাপত্তা কিংবা নাগরিক অধিকার নিয়ে তথ্যচিত্র বা স্ক্রিপ্ট লেখে, তবে তা সমাজকে বদলে দেবে।
গ্রুপ স্টাডি ও কো-কারিকুলার স্কিল: তরুণরা একা থাকলে হতাশা থেকে জুয়ায় জড়ায়। তাই বন্ধুদের নিয়ে ছোট ছোট টিম গঠন করে ‘স্টাডি টিউব’ বা ‘লার্নিং হাব’ তৈরি করা যেতে পারে, যা সম্মিলিতভাবে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
অনলাইন জুয়া একটি বহুমাত্রিক ব্যাধি, যার প্রতিকার শুধু আইন দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ। তরুণদের বুঝতে হবে, জুয়ার টেবিলে বা স্ক্রিনের পেছনে যে ক্ষণিক উত্তেজনা, তা আসলে নিজের জীবনকে ধ্বংস করার ফাঁদ। ইন্টারনেটকে জুয়ার আখড়া না বানিয়ে একে বানাতে হবে জ্ঞান অর্জনের লাইব্রেরি এবং নিজের ক্যারিয়ার গড়ার প্ল্যাটফর্ম। রাষ্ট্র, পরিবার এবং সচেতন তরুণ সমাজ—সবাই মিলে একযোগে কাজ করলেই কেবল একটি মেধাবী, দক্ষ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।
লেখক: কবি ও সম্পাদক (কবিয়াল)