রিপোর্টার্স২৪ ডেস্ক: টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে শুধুই রাজধানী ঢাকায় ৪০ শতাংশ ভবন ধসে যেতে পারে—রাজউক প্রকাশিত এই তথ্য নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে নগরবাসীর মধ্যে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন তুলনামূলক অনুকূল হলেও ভবন নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম, ভরাট জমিতে বহুতল নির্মাণ ও অত্যধিক জনঘনত্ব রাজধানীকে বিপজ্জনক অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে। ঢাকার কোন এলাকা তুলনামূলক নিরাপদ এ প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে।
কোন এলাকাগুলো তুলনামূলক নিরাপদ?
ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলছেন, ঢাকার উত্তর ও মধ্য অঞ্চলের মাটি মূলত মধুপুরের লাল মাটি—যা তুলনামূলক শক্ত। রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান, তেজগাঁও—এলাকাগুলো ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে কিছুটা এগিয়ে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, মাটির গঠন ভালো হলেই এলাকা নিরাপদ হয়ে যায় না।
ভবন অনিয়মই বড় ঝুঁকি
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, “ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ—এটা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কারণ ভবনের কাঠামো পরীক্ষা ছাড়া ঝুঁকিমুক্ততা নিশ্চিত করা যায় না।”
রাজউকের তথ্যমতে, ঢাকার ৯০ শতাংশ ভবনই কোনো না কোনোভাবে বিল্ডিং কোডের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে।পুরোনো ভবন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অনুমোদনের বাইরে গিয়ে বহুতল নির্মাণ—সব মিলিয়ে একই এলাকার মজবুত মাটিতেও ঝুঁকি বাড়ছে।
ভরাট জমিতে ঝুঁকি আরও বেশি
বসুন্ধরা, আফতাবনগরসহ রাজধানীর নতুন কিছু এলাকায় ডোবা-জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। এসব স্থানে “গ্রাউন্ড ইমপ্রুভমেন্ট টেকনিক” ছাড়া ভবন নির্মাণ হলে ভূমিকম্পে দুলুনি বহু গুণ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
মেক্সিকোর সান হুয়ানিকো শহরে ১৯৮৫ সালের ভূমিকম্পে ভরাট জমির কারণে ৭০ শতাংশ ভবন ধসে পড়ার ঘটনাও উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
পুরান ঢাকা কি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ?
পুরান ঢাকার সরু রাস্তা দুর্যোগ মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জ। তবে পুরনো কিছু ভবন শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন—কাঠামোর গুণগতমানই এখানে প্রধান বিষয়।
ঢাকার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’
ঢাকার ভেতরে সরাসরি কোনো ফল্ট লাইন না থাকলেও, দেশের বিভিন্ন সক্রিয় চ্যুতি রেখা বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দুইটি শনাক্ত ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’—ময়মনসিংহ ও রংপুর অঞ্চলের—ঢাকার জন্য অনির্দেশ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, কারণ এগুলো শনাক্ত করা কঠিন এবং কোনো পূর্বাভাসও পাওয়া যায় না।
ঢাকাকে বাঁচাতে করণীয়
স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে—রেট্রোফিটিং, ভবন পরিমার্জন, ব্যবহার পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে আংশিক হলেও ঢাকাকে নিরাপদ করা সম্ভব। ভবনগুলোকে গ্রিন, ইয়েলো ও রেড জোনে ভাগ করে শনাক্তকরণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কঠোর ব্যবস্থা—এগুলো বাস্তবায়ন ছাড়া পথ নেই।
তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন: ঢাকার ভবনগুলো যেভাবে একে অপরের সঙ্গে লাগোয়া, একটি ভবন ভেঙে পড়লে পাশের ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
উপসংহার
ঢাকার কোথাও পুরোপুরি নিরাপদ এলাকা নেই—এমনটাই ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ভূতাত্ত্বিকভাবে শক্ত মাটি, সঠিক নির্মাণশৈলী ও বিল্ডিং কোড মানা হলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।-বিবিসি
রিপোর্টার্স২৪/এসসি




