রিপোর্টার্স২৪ডেস্ক: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ পরাধীনতার শেকল ভেঙে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে বাঙালি জাতি। নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সমর্থন ও প্রতিবেশী ভারতের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৯ এবং ১৯৭০ সালের গণআন্দোলন বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ক্রমে শাণিত করে তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ জাতিকে চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়। এরই অংশ হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালির ওপর চালানো হয় ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা। এই হত্যাযজ্ঞ বাঙালির স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনিবার্য করে তোলে এবং সারা দেশে শুরু হয় সর্বাত্মক প্রতিরোধ।
এরপর ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। দেশজুড়ে সংগঠিত প্রতিরোধের মাধ্যমে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, যা টানা নয় মাস ধরে চলতে থাকে এবং অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২৫ মার্চের পর বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিবাহিনী ১১টি সেক্টরে বিভক্ত হয়ে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়। ছাত্রনেতৃত্বাধীন গেরিলা বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১০ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিরা আন্দোলন ও তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলে। ভারতের সামরিক, কূটনৈতিক ও মানবিক সহায়তা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় এই স্বাধীনতা। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ ও সীমাহীন কষ্টের বিনিময়েই জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। এই আত্মত্যাগের স্মরণেই প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হয় বিজয় দিবস।
দিবসটি উপলক্ষে আজ সকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণী দিয়েছেন। তাঁরা সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। সব সরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় জাদুঘরসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা এবং প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোও শহিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।
যাদের রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই লাল-সবুজ পতাকা ও মানচিত্র—তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ দেশের প্রতিটি প্রান্তে বাজবে মুক্তির গান, উড়বে জাতীয় পতাকা। শহর ও গ্রামজুড়ে পুষ্পাঞ্জলিতে স্মরণ করা হবে বীর শহিদদের।