| বঙ্গাব্দ
Space For Advertisement
ad728

ভূমিকম্পের এক ঝাঁকুনিতেই মৃত্যুপুরী! অপরিকল্পিত নগরায়নে ধ্বংসের মুখে ঢাকা-চট্টগ্রাম

reporter
  • আপডেট টাইম: জানুয়ারী ১৭, ২০২৬ ইং | ২২:৩৬:৫৪:অপরাহ্ন  |  ৯৪৩০২৭ বার পঠিত
ভূমিকম্পের এক ঝাঁকুনিতেই মৃত্যুপুরী! অপরিকল্পিত নগরায়নে ধ্বংসের মুখে ঢাকা-চট্টগ্রাম

শিমুল চৌধুরী ধ্রুব: বাংলাদেশ বড় ভূমিকম্পের দ্বারপ্রান্তে-এমন সতর্কবার্তা নতুন নয়। কিন্তু আশঙ্কাজনক বাস্তবতা হলো, সেই ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়েও দেশের দুই প্রধান মহানগর ঢাকা ও চট্টগ্রাম আজও প্রস্তুত নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল অবকাঠামো এবং বিল্ডিং কোডের তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা হাজারো বহুতল ভবন ভূমিকম্প হলে পরিণত হতে পারে মৃত্যুফাঁদে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প মুহূর্তেই ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

গত বছরের নভেম্বরে সংঘটিত এই শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প নতুন করে আলোচনায় এনেছে বাংলাদেশে ভূমিকম্প ঝুঁকির বিষয়টি। ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ও এর সীমান্তবর্তী এলাকায় অন্তত পাঁচটি সক্রিয় ভূমিকম্প উৎস বা ফল্ট রয়েছে। এসব ফল্ট থেকে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প উৎপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।

চট্টগ্রাম শহরের আর্থকোয়েক ড্যামেজ অ্যাসেসমেন্ট আরও ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যদি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে একটি বড় ভূমিকম্প হয়, তাহলে চট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডের ২ লাখ ৬২ হাজার ভবনের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ভবনই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর অর্থ, লাখো মানুষ এক মুহূর্তেই গৃহহীন বা প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। কিন্তু এত বড় আশঙ্কার মধ্যেও প্রশ্ন থেকে যায়- ভূমিকম্প মোকাবিলায় আদৌ কি কোনো কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে?

ভূমিকম্প প্রকৌশল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রবিউল আলম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “ভূমিকম্পের পর প্রথম দু-একদিন হইচই হয়েছিল। এরপর কেন যেন পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে গেছে। সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।” তাঁর মতে, পরিকল্পিত প্রস্তুতি না থাকলে বড় ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পে বড় ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ হচ্ছে দুর্বল ফাউন্ডেশন এবং মাটি পরীক্ষায় গাফিলতি। অনেক ক্ষেত্রেই দায়সারাভাবে মাটি পরীক্ষা করা হয়, আবার কোথাও কোথাও মাটি পরীক্ষা না করেই একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ভূমিকম্পের সময় (Liquefaction) ঘটার আশঙ্কা থাকে, যা পুরো ভবনকে হেলে পড়া বা ধসে যাওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের ভূ-কারিগরি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. আফতাবুর রহমান বলেন, “এই ইনভেস্টিগেশনগুলো আমরা খুব লাইটলি, কমন কনসেপ্টের ওপর বেইস করে করি। কিন্তু আসলেই এই জায়গাটাতে আমাদের স্ট্রংলি লুক আফটার করতে হবে।” তাঁর মতে, মানসম্মত জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন ছাড়া ভবন নির্মাণ ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

অপরিকল্পিত নগরায়নের আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাস্তা ও খোলা জায়গার সংকট। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি পরিকল্পিত শহরে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা জরুরি। কিন্তু ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাস্তবতা ভিন্ন। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ভবনের চাপে সরু হয়ে গেছে অলিগলি। ফলে ভূমিকম্প বা বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকারী যানবাহন ঢুকতেই পারবে না অনেক এলাকায়।

চুয়েট স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. রাশিদুল হাসান বলেন, “দুর্ভাগ্য হিসেবে আমাদের দেশে জনপরিসর, খেলার মাঠ, প্রশস্ত ফুটপাত-এসবের পরিমাণ দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। এর ফলে দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। সরকারি দপ্তরগুলোর এখনই চূড়ান্তভাবে কাজ করার সময় এসেছে।”

ইতিহাসও বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অঞ্চলে প্রতি ১০০ থেকে ১৫০ বছর পরপর ৭ বা তার বেশি মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়ে থাকে। বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ান টেকটনিক প্লেটের সংঘাতে ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে অনুভূত হয়েছিল ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সেই সময়সীমি আবারও ঘনিয়ে আসছে।

তাঁদের মতে, এখনই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা, বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং নগর পর্যায়ে সমন্বিত ভূমিকম্প প্রস্তুতি নিশ্চিত না করা হলে বড় ভূমিকম্পে ঢাকা ও চট্টগ্রাম পরিণত হতে পারে মৃত্যুপুরীতে। সময় থাকতেই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে সেই দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না-এমনটাই সতর্ক করে দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

রিপোর্টার্স২৪/ধ্রুব

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

ad728
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ রিপোর্টার্স২৪ - সংবাদ রাতদিন সাতদিন | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় ক্রিয়েটিভ জোন ২৪