টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: এক সময় শাল, গজারি, কাইকা, চাপালিশ, গর্জন, আজুকী, হরিতকী, আমলকী ও বহেড়াসহ নানা প্রজাতির গাছে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে ঘেরা ছিল টাঙ্গাইলের মধুপুরের পাহাড়ি অঞ্চল। তবে সময়ের পরিক্রমায় বনখেকোদের দৌরাত্ম্য, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা স্বজনপ্রীতি ও উদাসীনতার অভিযোগ এবং নির্বিচারে পরিবেশের অনুপযোগী গাছ রোপণের কারণে ক্রমেই উজাড় হচ্ছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাকৃতিক বনভূমি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামাজিক বনায়নের নামে পরিবেশবান্ধব দেশীয় প্রজাতির গাছ কেটে সেখানে আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস ও মেনজিয়ামের মতো বিদেশি ও পরিবেশের জন্য অনুপযোগী গাছ রোপণ করা হচ্ছে। এতে বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক বন্যপ্রাণী ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মধুপুর উপজেলার দোখলা রেঞ্জের অধীন পীরগাছা তিলেরটাল এলাকায় বন বিভাগের সামাজিক বনায়নের ২৯টি প্লটের প্রায় অর্ধেকের উপকারভোগীরা সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে প্লট বিক্রি করেছেন। এসব জমিতে বর্তমানে কলা, পেঁপে, হলুদ, পেয়ারা, আদা ও আনারসসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য চাষ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ওইসব প্লটে বন বিভাগ কোনো বনজ, ফলজ, ঔষধি কিংবা দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ করেনি। ফলে ধীরে ধীরে বনভূমি বেহাত হয়ে প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, একসময় মধুপুর গড়ের আয়তন ছিল প্রায় ৪৫ হাজার একর। বর্তমানে এর অর্ধেকেরও বেশি বনভূমি স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় প্লট মালিক লটপাড়া গ্রামের জিয়ার আলী তার নামে বরাদ্দ পাওয়া প্লট গিলাগাইছা গ্রামের ফেরদৌসের কাছে বিক্রি করেছেন। এছাড়া হাগুড়াকুড়ি গ্রামের আরশেদ, দেলু, দুলাল ও জলিল মেম্বার তাদের প্লট ধরংপাড়া গ্রামের শামীমের কাছে লিজ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় সূত্র জানায়, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে একটি প্রভাবশালী মহল প্রতি বছর গজারি বন ও উডলট বাগানের অংশবিশেষ দখল করে ধীরে ধীরে তাদের দখল সম্প্রসারণ করছে। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগ কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, তিলেরটাল এলাকায় এখনও প্রায় শত বিঘা গজারি বন রয়েছে। তবে পীরগাছা তেমাথা এলাকার পাকা সড়কের পাশে ঘর নির্মাণসহ বিভিন্ন কৌশলে এসব বনভূমি দখলের চেষ্টা চলছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে দোখলা ফরেস্ট রেঞ্জার সৈয়দ আমিনুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্ট বাগানগুলোতে বন বিভাগের গাছ রোপণ করা হবে। বিভিন্ন জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ে চারা প্রস্তুত না হওয়ায় রোপণে বিলম্ব হয়েছে। তবে গজারি বন উজাড় হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল বন বিভাগের উত্তরাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব বলেন, যেসব উপকারভোগীর বাগানে বন বিভাগের সৃজিত গাছ নেই, সেসব বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই মধুপুর বনে দখল প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে নতুন করে যাতে কেউ বনভূমি দখল করতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রিপোর্টার্স২৪/ মিতু