এ.এন.এন.মিনহাজুল হক,জবি প্রতিনিধি: সাফল্য ও গৌরবের ২০ বছর পার করল উচ্চশিক্ষা বিস্তারে সময়ের সেরা বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। ২০ অক্টোবর ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’। সুদীর্ঘ দেড়’ শ বছরেরও বেশি পুরোনো পুরান ঢাকার এই প্রতিষ্ঠানটি সংস্কৃতির ধারক-বাহক। গৌরব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যে এ প্রতিষ্ঠানের অবদান কম নয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা,উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ,সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
জবির পূর্বনাম জগন্নাথ কলেজ। ১৮৫৮ সালে ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল নামে প্রতিষ্ঠিত হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ১৮৭২ সালে নাম বদলে রাখা হয় জগন্নাথ কলেজ। আর এই নামটি রাখা হয় মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর বাবার নামে। ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই কলেজটি ১৮৮৪ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির এবং ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির কলেজে পরিণত করা হয়। ১৯৬৮ কলেজটিকে সরকারিকরণ করা হলেও পরের বছরই আবার বেসরকারিকরণ করা হয়। ১৯২১ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠা হয় তখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং জগন্নাথ কলেজের ডিগ্রির শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গ্রন্থাগারের বই-পুস্তক, জার্নাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে জবি আইন-২০০৫ পাশের মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়।
১৮৫৮ সালের অবৈতনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ব্রাহ্ম স্কুল’ সময়ের পরিক্রমায় আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছরের মধ্যে প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে।
২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর একরাশ স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রা শুরু করে। পথচলার শুরুতে নানা সংকট থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিপূর্ণ, আধুনিক ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শর্তাবলি আবশ্যক, সে পথেই এগিয়ে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। মানসম্মত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা, যুগোপযোগী জ্ঞান বিতরণ, অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে সংগতি রক্ষা ও সমতা অর্জন, আধুনিক জ্ঞান ও সংস্কৃতির চর্চা, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রদানে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সাতটি অনুষদের অধীনে ৩৮টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ হাজারের বেশি। ৭০০-এর অধিক শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যৌথ উদ্যোগে এমফিল ও পিএইচডি গবেষকরা গবেষণাকর্মের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করে চলেছেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প-সংস্কৃতি, সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম ও সুকুমারবৃত্তি চর্চার ১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শিক্ষার্থীদের যেসব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া দরকার, সে তুলনায় কিছুটা হলেও পিছিয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ক্যানটিনটিও নানা সমস্যায় নিয়মিতভাবে খোলা থাকে না। ক্যানটিনে খাবারের দাম চড়া।সম্প্রতি, নানা বিতর্কের মধ্যে দিয়ে নতুন একটি ফুডকাট চালু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।এতেও খাবারের মান,দাম নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ।
দেশসেরা অন্যতম এ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রধান সমস্যা হলো আবাসন সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আবাসন সংকটের সমাধানে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ব্যাপারে বরাবরই উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে।বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হল বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের আসনসংখ্যাও সীমিত। সাম্প্রতি, সম্পূর্ণ আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশন উদোগ্যে ৮০০ ছাত্রের আবাসনের ব্যাবস্হা করেছেন।আবাসন সুবিধার আশায় শিক্ষার্থীদের ২০ বছর কেটে গেল।
ঢাকার কেরানীগঞ্জে ২০০ একর জমির ওপর দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপনের কাজ এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ১ বছর ১ মাস হয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি নেই বললেই চলে।প্রাথমিক প্রকল্পের ১০% কাজ ও সম্পন্ন হয়নি।দ্বিতীয় ক্যাম্পাস দেখার জন্য হয়তো জবিয়ানদের আরো কয়েক যুগ অপেক্ষা করতে হবে।
জবির ক্যাম্পাসে ইন্টারনেটের গতির কচ্ছপের গতির চেয়েও স্লো। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে এসি নেই। বিভিন্ন স্থানে পানির কল বসালেও অধিকাংশ সময় কল গুলো নষ্ট থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমাবর্তনের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আকাঙ্ক্ষিত প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২০ সালের ১১ জানুয়ারি। প্রতিবছর সম্ভব না হলেও অন্তত দুই-তিন বছর পরপর যাতে সমাবর্তন আয়োজন করা যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এ ব্যাপারে বর্তমান প্রশাসন আগামী বছরের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে সমাবর্তন আয়োজন চিন্তা করছেন বলে জানিয়েছেন।
ইতমধ্যে,জগ্ননাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনের রোড়ম্যাপ ঘোষণা হয়েছে আগামী ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শতবাধা,রন্ধ্রে রন্ধ্রে সমস্যা জর্জরিত জবির শিক্ষার্থীরা বিসিএস, জজ, ব্যাংকসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জবি শিক্ষার্থীদের সাফল্য অর্জন করছে।
ইতিহাস-ঐতিহ্য বজায় রেখে নিত্যনতুন গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে জবি এগিয়ে যাবে অনেক দূর, ২০ তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে এটাই শিক্ষার্থীদের চাওয়া।
রিপোর্টার্স২৪/প্রীতিলতা